NYnews52.com a e-news paper in Bengali and English with video excerpts.
Logo: NYnews52.com


সব গ্রন্থই পবিত্র
অতএব জিকির থামিয়ে বলো
এতোকাল ক'খানা পড়েছো।

সব ঘরই পবিত্র
অতএব তাণ্ডব থামিয়ে বলো
তুমি তার ক'খানা গড়েছো।



সাহিত্য

জন্মদিনের কড়চা

নাজনীন সীমন




ছোটোবেলায় জন্মদিন একটা বিশেষ দিন বলেই মনে হতো। এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব ছিলো মায়ের। বাবারটা তখনো বুঝতে পারিনি কেননা খোলসের ভিতরে থেকে প্রকট গাম্ভীর্য নিয়ে একটি মানুষ যে এতো ভালবাসা ধারণ করতে পারেন, তা বোঝার বয়স তখনও হয়নি আমার। জন্মদিনটা ছিলো অনেকটাই উৎসবের মতো; খাওয়া দাওয়া, আত্নীয়, বন্ধু--সব মিলিয়ে বিশাল ধূমধাম। মায়ের হাতের সেই দিনের চটপটি যেনো সব কিছু ছাড়িয়ে যেতো। তাঁর হাতে বানানো ফ্রক পরে হয়তো নিজেকে প্রজাপতি ভাবতাম। তবে সবচে' আনন্দের ছিলো রাত বারোটার সময়টা। প্রতি ডিসেম্বরের ১৫তে বাবা মিষ্টি এনে রাখতেন। ঠিক বারোটায় মা সব্বাইকে মিষ্টি খাওয়াতেন। কিন্তু আমার ভাগে পড়তো দু'বার--একটি বিজয় দিবস অন্যটি আমার জন্ম দিবসের জন্য। আর জন্মদিনের সন্ধ্যায় উপহার খোলা তো ভিন্ন রকম আনন্দের ছিলো্। নিয়মিত জুটতো আমার প্রিয় উপহার--বই ও কলম। জন্মদিনে উপহার পাওয়া কলমগুলো এখনো সংগ্রহে আছে, কিন্তু বইয়ের ক্ষেত্রে যা হবার তাই হয়েছে--পড়ুক না পড়ুক, বই দেখলেই কিছু মানুষের ধার করতে ইচ্ছে হয় এবং তারপর রীতিসিদ্ধভাবে ভুলে যেতে হয় সে কথা। সে সময়টা মানুষ খুব হিসেবীে এবং রুচিসমৃদ্ধ ছিলেন বটে। বই, কলম ইত্যাদির সাথে অনেকেই উপহার দিতেন প্রাইজ বন্ড যা দেখলেই আমার মন খারাপ হয়ে উঠতো এই ভেবে যে এগুলো আমার কোন কাজে লাগবে। কিন্তু পত্রিকার পাতায় মায়ের সাথে বসে প্রাইজ বন্ডের নম্বর মেলানোর অপার্থিব আনন্দের কথা ভাবলে মন কারাপ বোধটা অনেকটাই প্রশমিত হতো।

একটু বড়ো হতেই জগৎ সংসার সামান্য দেখে মনে হতে শুরু করলো জন্মদিন পালনের মানে কি? এটা বিশেষ কোনো দিন কিনা? বছরের অন্যান্য দিন থেকে এর তফাৎ কি? প্রবহমান জীবনকে প্রতি বছরে এভাবে খণ্ডিত করে দেখার মানে কি? চারপাশে এতো সমস্যা থাকতে, জন্মদিনে হৈ হুলোড় করা আসলে কতোটা যুক্তিসঙ্গত? এসব প্রশ্নের উত্তরগুলো খুব একটা স্বস্তিপূর্ণ ছিলো না; বলা ভাল, নির্দিষ্ট কোনো উত্তর ছিলো না। তাই দিনে দিনে বিব্রত বোধ করতে থাকলাম এমন আয়োজনের বাহুল্যতায়। কিন্তু রাত বারোটায় মায়ের সাথের ঐ সময়টুকু কোনো ভাবনার বদলেই বন্ধ করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি।

সে যাই হোক, কোনো বছর কোনো কারণেই এ রীতির ব্যত্যয় ঘটেনি। ফলতঃ অন্যান্য যাবতীয় উৎসব ধর্মীয় থেকে জাতীয় থেকে আমাদের তিন ভাই বোনের জন্মদিন পালনের নিতান্তই পারিবারিক উৎসবগুলো হয়ে উঠেছিলো আমাদের প্রতি বছরের আনন্দঘন নিয়ম। এমনি করে দিন কাটতে কাটতে একটা সময়ে এসে ছিটকে পড়তে হলো আমাকে। কোনো সুখচক্র থেকে সরে আসা তো ছিটকে পড়া-ই। কিন্তু পরিবারে চলতে লাগলো একই নিয়ম। ঠিক রাত বারোটায় মিষ্টি, ষোলো তারিখে খাওয়া দাওয়া ইত্যাদি। অনেকের মুখে শুনেছি, মা এ দিনটাতে কাঁদতেন। তার খানিকটা রেশ পেতাম তাঁর জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য করা ফোনের ভারী কিন্তু আদুরে কণ্ঠে। মনে হতো গলে যাচ্ছি আমি। খুব ইচ্ছে করতো আগের মতো মায়ের বুকে থাকি খানিকক্ষণ, তাঁর হাতে বানানো ফ্রক পরে ঘুরে বেড়াই ঘরময়। দাঁতে দাঁত চেপে সে যন্ত্রণা সহ্য করেছি; কোনোদিন বুঝতে দিইনি আমার পাহাড়সমান ভারী বুকের কথা, ভেসে যাওয়া চোখের কথা।

দূরে থাকলেও এই উৎসব আমেজ থেকে দূরে থাকতে হয়নি। আমার জীবন সঙ্গী, হাসানআল আব্দুল্লাহ শুরু থেকেই ঠিক একই কাজটি করতোো শুরু করলো--সেই ঠিক বারোটায় মিষ্টিমুখ করানো, ছবি তোলা, পরের দিন অনেক উপহারের সাথে এক ডজন গোলাপ হয়ে উঠলো নিয়ম আবার। ছান্দসিক কবির কোনোদিন ছন্দপতন হয়নি এ ক্ষেত্রে, বরং নতুন নতুন ছন্দ আবিষ্কার করে মোহাবিষ্ট করে তুলছেন তিনি। আবারো পড়লাম আরো এক সুখচক্রে। তফাৎ কেবল এখন নিজে হাতে রান্না করে অতিথি আপ্যায়ন করি। এভাবেই চলছিলো বেশ। তারপর...

তারপর মা অসুস্হ হতে থাকলেন। বিছানায় শুয়েও তিনি জড়ানো কণ্ঠে ফোনে "শুভ জন্মদিন" বলতে ভোলেননি কখনো। শেষের দিকে তাঁর কথা এতো জড়ানো ছিলো যে বুঝতেই পারতাম না কি বলছেন; কেবল হৃদয়ের সেতারে টুংটাং করে ভালবাসার ছোঁয়া লাগতো--ঠিক বুঝে যেতাম কি বলতে চাইছেন অতো কষ্ট করে। ভীষণ, ভীষণ অসহায় মনে হতো নিজেকে তখন। বারবার মনে হতো এক ছুটে চলে যাই মায়ের কাছে। কিন্তু মন আর বাস্তব যে ঢের দূরে বসবাস করে সেটা আমি ততোদিনে বুঝতে শিখে গিয়েছিলাম।

তবে ভাগ্য কেনো যেনো আমাকে সে সুযোগ করে দিয়েছিলো। শেষবারের মতো আমি নিতে পেরেছিলাম মায়ের স্পর্শ নাড়ীছেঁড়ার দিনে। মা তখন প্রায় সময়ই অসুধের ঘোরে অচেতন থাকেন, সারা শরীর ফোলা, কিছুই খেতে পারেন না; তবু সেই দিন তিনি রাঁধলেন নিজ হাতে হাজারো বারণ সহ। মনে ঠিকই বুঝেছিলাম এই হয়তো তাঁর হাতের শেষ খাওয়া আমার, কিন্তু বাস্তব স্বীকার করতে চাইনি। কেইবা কল্পনা করতে পারে তার আশা ভরসার স্হল পরম মমতার মানুষটি চলে যাবে একেবারে সমস্ত ধরা ছোঁয়ার বাইরে, হোক না সে যতোই বাস্তববাদী?

২০০৬-এর ১৬ই ডিসেম্বর হাসানআল আব্দুল্লাহ যখন জন্মদিনের কথা বললো, সদ্য মা হারানো হৃদয়টা যেনো খানখান হয়ে গেলো। সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছিলাম, এই বাহুল্য আর নয়। জন্মদিন মানেই মা। কিন্তু আমার তো মা নেই আর। কেবল তাঁর জন্য ব্যক্ত ও অব্যক্ত গভীর যন্ত্রণা আছে যা নিয়মিত নোনা জল হয়ে বেরোয়। কিন্তু ততোদিনে আমার চারপাশের অনেকেরই অভ্যেস হয়ে গিয়েছি বিজয় দিবসের এই যৌথ নিয়মে। তাছাড়া 'শব্দগুচ্ছ' কবিতা পত্রিকার পুরস্কার ঘোষণার দিন হিসেবেও এর প্রচলন শুরু হয়েছে বেশ কিছুদিন। সর্বোপরি, আমার নাড়ীছেঁড়া মানিক ততোদিনে ঢের বুঝতে শিখেছে। তার প্রতিফলন দেখাতে গিয়ে যখন বললো আমারটা পালন না করলে তারটাও ১৮ তারিখ পালন করবে না সে এবং কিছুতেই যখন রাজী করাতে পারলাম না, তখন আমার আর নিয়ম ভাঙা, শোক পালন করা--কিছুই হয়ে উঠলো না। পরাজয়ও কখনো কখনো আনন্দ দেয় বটে।

মা গেলেও একই নিয়ম এখনো চালু আছে বাড়ীতে। ঠিক একই রকম মিষ্টি খাওয়া, দুপুরে খাবার টেবিলে ভাল মন্দ রাখা। এমনকি অসুস্হ বাবা কেক নিয়ে আসেন আমার জন্য। ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা পাখীর মতো কিচিরমিচির করে জন্মদিনের শুভেচ্ছাা জানাতে ভোলেনা; একটি বারের জন্যও কেউ ভোলেনি। ভাবি, এক জীবনে এতোখানি পাওয়র যোগ্যতা কি আমার আছে? কি দিয়ে এ দায় শোধ করতে পারি আমি? শোধ করা কি খুব প্রয়োজন না সম্ভব?

ততোদিনে প্রত্যক্ষ না হোক, পরোক্ষ ভাবে জীবনচক্রে জড়িত হয়েছে আরো অনেকে। ফেসবুকের হাজারের উপর বন্ধুর মধ্যে হাতে গোণা কারো কারো সাথে হৃদ্যতা এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে তারা হয়ে উঠেছেন আমার পরমাত্নীয়। আবার সময়ে রক্ত সম্পর্কের অনেক আত্নীয়ই টুপ করে কখন কোথায় যেনো ঝরে পড়ে গেছে, টেরই পাইনি। কেবল মাঝে মাঝে পুরোনো পথে হাঁটতে গিয়ে কষ্ট হয়। নানাভাবে, দেয়ালে, চিঠিতে, ফোনে লিখে অনেকেই শুভেচ্ছা জানান--বেশীর ভাগই নিয়ম মেনে, খুব অল্প সংখ্যক সত্যিকারে ভালবেসে। কে যে কোনটা, সেটা খুব বুঝতে পারি; তবু মনে হয়, বেঁচে থাকারই একটি অংশ এটি। অন্তত ৪০ সেকেণ্ড সময় ব্যয় করে কেউ যদি ভাসমান জগতে ভাসমান শুভেচ্ছা দিয়ে মনে রাখার কথা জানায়--তাই বা মন্দ কি! তাই সবার প্রতি কৃতজ্ঞতায় নুয়ে আসে মাথা। জীবনের একটি বাঁকে এসে আবার যুক্ত হয়েছে আমার শিক্ষার্থীরা। কে যে কখন কিভাবে প্রথম খোঁজ পেয়েছে জানিনা, কিন্তু প্রতি বছর এরা আমাকে সুখ সাগরে ভাসায়। কেউ এসে মৃদু স্বরে 'শুভ জন্মদিন' বা 'হ্যাপি বার্থ ডে' বলে, কেউ সজোরে শুভেচ্ছা জানায়। হাজারো চেষ্টা করেও অন্তর্জালের এই চরম সময়ে গোপন রাখা সম্ভব হয়নি এ তথ্য। আবার কোনো কোনো পাগল আছে তাদের সামান্য সঞ্চয় বা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই মা বাবার কাছ থেকে নিয়ে উপহার কিনে আনে যা বিব্রতকর অবস্হার চূড়ান্তে ওঠায় আমাকে। আর শুভকামনা জানিয়ে তাদের হাতে লেখা মন্তব্যসহ কার্ড পেয়ে আমি কেবল নির্বাক হয়ে থাকি, হৃদয়ের গভীর আবেগ প্রকাশিত হয় দুই চোখের জলধারায়। অসংখ্যবার বারণ সত্ত্বেও যারা এমনটা করে, আর কিভাবে তাদের ভালবাসার ঋণ শোধ করতে পারি, জানা নেই। আর পুরোনো শিক্ষার্থীরা যখন দিনটি মনে রাখে, তখন আনন্দ বাড়ে শতগুণ। মনে হয়, এই তো জীবন।

জীবনের এই চলমানতায় সাম্প্রতিক সংযোগ সন্তানের ভালবাসার প্রকাশ। নিজের জমানো টাকায় স্কুল থেকে ফেরার পথে উপহার কিনে লুকিয়ে রেখে সমস্ত অভিব্যক্তি দৈনন্দিনকতার আড়ালে রেখে রাত ঠিক বারোটায় যখন সামনে এনে 'হ্যাপি বার্থ ডে' বলে অতি আনন্দে চোখ ভেজা ছাড়া আর কোনো প্রকাশযোগ্য অনুভূতি খুঁজে পাইনা। গোটা দিনের ক্লান্তি সত্ত্বেও শরীর চনমনে হয়ে ওঠে, অপার্থিব এক সুর বেজে ওঠে হৃদয় তন্ত্রীতে। বাকরুদ্ধ বসে থাকি কিয়ৎক্ষণ।

হয়তোবা এর পরের পর্যায়ে থাকবে ছোট্রো হাতে সন্তানের সন্তানদের পরম মমতায় লিখে দেয়া "আই লাভ ইউ গ্রান্ডমা। হ্যাপি বার্থ ডে...।" অথবা এমনও হতে পারে, সময়ের তোড়ে প্রিয় সন্তানটিরই মনে থাকবে না এই দিনটির কথা। মাসখানেক পর হয়তো দুঃখপ্রকাশ করে একটি ফোন দেবে কিংবা বেমালুম উধাও হয়ে যাবে দিনটি তার পঞ্জিকা থেকে। সব কিছুই সম্ভব, হতে পারে সবই। জীবন কোথায় দাঁড় করাবে, সেটা সময়ই জানে। হয়তো একসময় শিক্ষার্থীরাই কেবলমাত্র দিনটি মনে রাখবে যতোদিন ছাত্র থাকবে। হয়তো বহুদিন পর অনেক দিন আগের কোনো শিক্ষার্থী শুভ জন্মদিন জানানোর জন্য একটি লাইন লিখবে। জানিনা।

কেবল জানি, জন্মদিন এখন নিরর্থক কিছু না আমার কাছে। আমি টের পাই আমার শিকড়কে। বুঝতে পারি নাড়ী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এখানে আছি। মনে মনে খুব চাই সেই নিরাপদ স্হানে ফিরে যেতেম অবাস্তব হলেও। স্বপ্নের কি অিার সীমারেখা থাকতে আছে? অন্য আর সব দিনের মতো হলেও এই দিনে মায়ের অস্তিত্ব জেঁকে বসে আমার উপর। মা না থাকার যন্ত্রণায় কুঁকড়ে থাকি, প্রচণ্ড ক্ষরণ হয় হৃদয়ে ও চোখে। খুব জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে মাকে। ভীষণ সাধ হয় বুকে লেপ্টে থেকে মায়াবী একক সুগন্ধ নিতে, আঁচলে মুখ মুছতে, আঁচল ধরে বাড়িময় ঘুরতে। সময়ের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া মা কোনোক্রমেই ফিরবে না জেনে অসহায় বোধ করি। কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হয়না তাঁর অদৃশ্য উপস্হিতি কি বলতে চায় আমাকে। জন্মদিনের সুনির্দিষ্ট অর্থ এখন জানা আছে আমার।


Contact Us